অ্যাডাম স্মিথ: বাজার অর্থনীতির প্রারম্ভ (Adam Smith: The Dawn of Market Economy)


১.
অ্যাডাম স্মিথের(১৭২৩-১৭৯০) কাছে বিধাতা হচ্ছে মূলত মুক্তবাজার অর্থনীতি,যা ব্যক্তিকে দেয় বিকাশের সর্বাধিক স্বাধীনতা, সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে শৃঙ্খলা এবং নিয়ে আসে সর্বাধিক কল্যাণ! যদি বাজার ঠিকভাবে চলে,ব্যক্তি স্বাধীন মতো অর্জন করতে পারে মুনাফা,তবে রাষ্ট্রীয় আয়ও বেড়ে চলে সমানতালেই।তাই সহজেই বোঝা যায় কেন ক্লাসিকাল অর্থনীতির এই মহাগুরু বাজারকে বসিয়েছেন প্রায় বিধাতার আসনে যে কিনা নিপুণভাবে চালিয়ে নেয় ব্যক্তি এবং সমাজকে।
অ্যাডাম স্মিথ ছিলেন মূলত একজন মোরাল ফিলোসফার।তিনি গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিশাস্ত্রের অধ্যাপক থাকার সময় তাঁর প্রথম বই ‘The Theory of Moral Sentiment ‘ প্রকাশ করেন।যেখানে তিনি বলেন মানুষের কর্মের আদি উৎস হচ্ছে আত্ম-স্বার্থ। মানুষের স্বাভাবিক নীতিই হচ্ছে নিজ স্বার্থের অন্বেষণ করা।সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানুষের আত্মপ্রীতিকে খারাপ নয়,বরং অপরিহার্য গুণ বলে তিনি উল্লেখ করেন। কেননা এই আত্মস্বার্থ সমাজের সামগ্রিক কল্যাণের পরিপন্থী নয়।ব্যক্তির আত্ম-স্বার্থ এবং সমাজের সমষ্টিগত স্বার্থের মধ্যে মূলত কোন তফাত নেই।আত্মস্বার্থ থেকে পরিচালিত কর্মের ফলে সাধারনভাবে সমাজের উন্নতিই হয়।কেননা যদি ব্যক্তির স্বার্থ এবং তা থেকে উদ্ভুত ইচ্ছাশক্তি না থাকে,তবে অর্থনীতি অচল হয়ে পড়তে বাধ্য।
২.
মানব চরিত্রের এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক দর্শনের ব্যাখ্যার উপরই মূলত স্মিথের অর্থনীতি এবং রাজনীতির বনিয়াদ গড়ে উঠেছে,যার প্রকাশ ১৭৭৬ সালে প্রকাশিত তাঁর সুবিখ্যাত ‘The Wealth of Nations’বইটি। অবাধনীতি (Laissez faire), অবাধ প্রতিযোগিতা,স্বনিয়ন্ত্রিত বাজার,অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি-এই হচ্ছে স্মিথের ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু।আর এই কেন্দ্রবিন্দু থেকেই তিনি আবিষ্কার করেন ব্যক্তির সম্পদ সৃষ্টিতে শ্রম,মুক্ত বাজারে অদৃশ্য হাতের এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে শ্রমবিভাগ(Division of Labor) ও বিশেষীকরণ (Specialization) এর গুরুত্ব।
স্মিথ বলেন,অনিয়ন্ত্রিত আর্থনৈতিক উদ্যোগই কোন জাতির সম্পদের উৎস।ব্যক্তি যখন স্বাধীনভাবে নিজ শ্রমের মাধ্যমে পণ্য তৈরি করবে,বাজারে নিজের জন্য সর্বাধিক মুনাফার ক্ষেত্র তৈরি করবে তখন ব্যক্তির কল্যাণের সাথে সাথে সমাজেরও সর্বাধিক কল্যাণ সাধিত হয়।কেননা এতে শেষ পর্যন্ত জাতীয় প্রবৃদ্ধিরই বৃদ্ধি ঘটে।আর অসংখ্য ব্যক্তির উৎপাদিত পণ্যের বাজারে অংশগ্রহণ ও তার মূল্য মূলত নিয়ন্ত্রিত হয় এক অদৃশ্য হাতের দ্বারা।কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই অদৃশ্য হাত কিভাবে কাজ করে?
স্মিথ দেখাচ্ছেন,উৎপাদন নিজের থেকেই ক্রেতার চাহিদার ধরনের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেবে,তা সে চাহিদা যেমনই হোক আর পরিবর্তন যতই যে ধরনেরই হোক।মার্কেট মেকানিজমে অবশ্যই ক্রেতা এবং বিক্রেতার মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্য তৈরি হবে।(পরবর্তীতে রিকার্ডো যাকে যোগান এবং চাহিদা দিয়ে ব্যাখ্যা করেন) আর এ কারনেই বাজারে সরকারের হস্তক্ষেপ কোনভাবেই কাম্য নয়।কেননা মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক বাজারেই কেবল সম্পদ তার সর্বাধিক প্রবৃদ্ধিতে পৌঁছতে পারে।

৩.
আর এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মূলত উৎপাদনের আরো একটা বিষয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করে,শ্রম বিভাজন।শ্রম বিভাজনের মাধ্যমেই কেবল উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি করা যায়।কেননা শ্রমবিভাগ উন্নততর দক্ষতা,সময় সংক্ষেপ এবং সাধারন দক্ষতা সুনিশ্চিত করে।আর এই উৎপাদনের কলেবর বৃদ্ধি পেলেই কেবল বাজার সম্প্রসারণ এবং পুঁজির সঞ্চরণ সম্ভব হয়। মানুষ একা তার প্রয়োজনীয় সবকিছু বানানোর চেষ্টা না করে যদি একটি মাত্র জিনিসে পারদর্শী হয়,তাতে উৎপাদন ক্ষমতা এবং আয় অনেক বেড়ে যায়।এতে করে করে শ্রমের বিশেষীকরণ বা Specialization হয়।উচ্চতর উৎপাদন ক্ষমতা বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয়,আর উৎপাদনের পরিমান এতো পরিমান বৃদ্ধি পায় যে বাজারের সম্প্রসারণ জরুরি হয়ে পড়ে।এতে করে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী হতে থাকে।ব্যক্তির পুঁজির সঞ্চয়ও অধিক সমৃদ্ধির দিকে চলে।

৪.
যেহেতু বাজার অবাধ বাণিজ্যের ফলে সম্প্রসারিত হয়,সে কারনে অবাধ বাণিজ্যই উৎপাদনের শ্রেষ্ঠতম উপায়।আর এই সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করেই স্মিথ তাঁর রাষ্ট্রের ধারণা ব্যাখ্যা করেন।রাষ্ট্রের কার্যাবলী হবে ন্যূনতম।সমাজ এবং অর্থনীতিতে কোন রকম রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের যৌক্তিকতা নেই।অতিমাত্রায় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যক্তির আত্মস্বার্থকে ক্ষুণ্ণ করে এবং জাতির কল্যাণ সাধনে ক্ষতি করে।সরকারী নিয়ন্ত্রণ আর্থনৈতিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকারক। রাষ্ট্রের কাজ শুধু শান্তি,শৃঙ্খলা রক্ষা এবং প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করা। ব্যক্তি স্বাধীনতা তো বটেই,বাজারেও যে কোন ধরনের রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ কাম্য নয়।এতে করে অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট হয়।
অর্থাৎ বর্তমানে যে ‘Minimal State’ এর কথা বলা হয় তা অতি অবশ্যই স্মিথের ভাবনা দ্বারা প্রভাবিত। আর স্মিথের রাষ্ট্র ভাবনাটাও অনেকাংশে জন লকের দ্বারা প্রভাবিত।
অ্যাডাম স্মিথের ‘Wealth of Nation’বইটির প্রভাব প্রায় সুবিশাল।রিকার্ডো,মার্কস থেকে শুরু করে বর্তমানের মিল্টন ফ্রিডম্যান-প্রায় সব অর্থনীতিবিদই স্মিথের অর্থনৈতিক ভাবনার কাছে ঋণী।বলা যায় পুঁজিবাদের যে বিকাশ অষ্টাদশ শতকে শুরু হয়েছিলো,স্মিথ সে বিকাশটাকেই প্রথম তুলে ধরলেন;তাকে সুসংহত করে যুগের চাওয়াকে পূরণ করলেন।আর তাই সহজেই বোঝা যায় কেন ‘ওয়েলথ্ অব নেশানস্’বইটি পাশ্চাত্য সভ্যতার সর্বোত্তম গ্রন্থগুলোর একটি হয়ে আছে

Comments